ঋণ নিয়ে উৎপাদন করা শত কোটি টাকার কাগজ নিয়ে বিপাকে কর্ণফুলী পেপার মিল

107

মাহফুজ আলম, কাপ্তাই প্রতিনিধি >>>
২৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজ উৎপাদন করে বিপাকে পড়েছে কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম)।  প্রতিশ্রুতি মতো এনসিটিবি কাগজ না নেওয়ায় মহাসংকটে পড়েছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম কাগজ কল কর্ণফুলী পেপার মিল।  এমনিতেই লোকসানে থাকা এই বৃহত পেপার মিলটি গভীর ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে পড়ে ন্যূয়ে পড়েছে।  শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলী পেপার মিলে উৎপাদিত সাদা কাগজের স্তুপ অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে।  কেপিএম উৎপাদিত সাদা কাগজের প্রধান ক্রেতা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্য পুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।  অথচ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত এনসিটিবি পুস্তক ছাপানোর জন্য কেপিএম থেকে ১০০০ মেট্রিক টন কাগজ সংগ্রহ করে এনসিটিবি। যদিও প্রতি বছর তাদের এই চাহিদা ১০ হাজার মেট্রিক টন।  ১০ হাজার মেট্রিক টনের স্থলে ১ হাজার মেট্রিক টন নেয়ার ফলে বড় ধরণের ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছে কেপিএম।  ফলে স্তুপ আকারে পড়ে থাকা এসব কাগজ নিয়ে বিপাকে পড়েছে কেপিএম কর্তৃপক্ষ।  ঋণ নিয়ে উৎপাদন করা এসব কাগজ সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় প্রায় শত কোটি টাকার লোকসানের আশঙ্কায় পুড়ছে প্রতিষ্ঠানটি।
জানা গেছে, এনসিটিবি প্রতি বছর কেপিএম থেকে ১০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি কাগজ সংগ্রহ করতো।  চলতি বছর ১০০ মেট্রিক টনের বেশি কাগজ ক্রয় করার চুক্তি থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তা এখনো নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।  এর ফলে কেপিএম এর সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য খরচ নির্বাহ নিয়ে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।  পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জানা যায়, গত তিন বছর আগেও কেপিএম বছরে প্রায় ১২০ কোটি টাকা লোকসানে ছিল।  সরকারি নির্দেশে কেপিএম’র ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ কাদেরের নেতৃত্বে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে কারখানার লোকসান বর্তমানে কমে গিয়ে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকায় নেমে আসে।  বিসিআইসি, শিল্প মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে কেপিএম কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির সর্বস্তরের শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে ধাপে ধাপে লোকসান কমানোর পাশাপাশি কাগজ উৎপাদন অব্যাহত রাখার মাধ্যমে কেপিএম ইতিবাচকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সচেষ্ট হয়।  যখন লোকসান কমিয়ে প্রতিষ্ঠানটি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতা অর্জন করছে, ঠিক তখনই এনসিটিবি কেপিএম থেকে কাগজ সংগ্রহ বন্ধ করে দেয়।  এ অবস্থায় কেপিএম পুনরায় লোকসানের দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কায় নিমজ্জিত হয়েছে।  এমতাবস্থায়, কেপিএমকে সচল রেখে সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় কাগজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিসিআইসি থেকে সম্প্রতি সময়ে ২৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন বৈদেশিক পাল্প আমদানি করে কেপিএম।  এসব কাগজ মূলত আগামি শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবির জন্য উৎপাদন করা হয় যা এনসিটিবির চাহিদা ছিল।  বর্তমানে এনসিটিবি চাহিদা অনুযায়ী ৬০ গ্রাম মানের উন্নত ১ হাজার মেট্রিক টন কাগজ উৎপাদন করে কেপিএম। এছাড়াও এখনো কাগজ উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে।  কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো চাহিদামাফিক কাগজ নিচ্ছে না এনসিটিবি।  ফলে প্রায় শত কোটি টাকার কাগজ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে কেপিএম।  এসব কাগজ কোনো কারণে বিক্রি করতে না পারলে বড় ধরণের পতন ঘটবে কেপিএম এর- এমন আশঙ্কা নিয়ে দিন পার করছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকেরা।
এ ব্যাপারে কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. এমএ কাদের দৈনিক চট্টগ্রামকে বলেন, কর্ণফুলী পেপার মিলের সাথে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্পর্ক রয়েছে।  স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেপিএমকে বাঁচাতে বৈষম্য দূর করায় ভূমিকা রাখেন। এখানকার শ্রমিক জনতার পক্ষে এবং কেপিএম এর উন্নয়নের স্বার্থে তিনি বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে রাখেন।  পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেপিএম এর কাগজ কিনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেন।  দেশের বিভিন্ন মহলের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে কেপিএমকে সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরাও।  ইতোপূর্বে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কাগজ সংগ্রহ না করায় কেপিএম এ কাগজের স্তুপ জমে পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে।
কাদের বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে এনসিটিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা কেপিএম থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য হয়।  যার ফলে নানাবিধ সংকট সত্বেও ঐতিহ্যবাহী কেপিএম আজও কাগজ উৎপাদনে রয়েছে।  বর্তমানে কেপিএম নিয়ে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।  কর্ণফুলী পেপার মিলের উৎপাদিত কাগজ এনসিটিবিসহ দেশের বিভিন্ন সংস্থা যাতে ডিপএম পদ্ধতিতে কিনে নেয় সেই বিষয়ে নির্দেশনা দিতে কেপিএম এর সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন বিভাগ, সর্বস্তরের শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা এবং সমগ্র পার্বত্যবাসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ বিষয়ে জানতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যাড. নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন এমপি, সচিব কে এম আলী আজমকে একাধিকবার ফোন করলেও তাদের সংযোগ পাওয়া যায়নি। তবে বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে পাওয়া গেলেও তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানার পর অসুস্থতার কথা বলে ফোন কেটে দেন।

ডিসি/এসআইকে/এমএ