নিজের শরীর সম্পর্কেও নারীর অজানা অনেক

দৈনিক চট্টগ্রাম ডেস্ক >>>
অপরকে চিনতে না পারার আক্ষেপ আমাদের প্রায় সবার।  অথচ আমরা নিজেরাই কি নিজেদের পরিপূর্ণভাবে চিনি?  গবেষণা বলছে, মন তো অনেক দূরের কথা, মানুষ এখনো নিজের শরীরকেই ঠিকমতো চিনে উঠতে পারেনি।  এই অজ্ঞতা তাকে নিয়মিত ঠেলে দেয় নানা জটিলতার দিকে।
ভ্যাজাইনা অবসকিউরা নামের নতুন এক বইয়ে এসেছে অধিকাংশ মানুষ নারীর যোনি নিয়ে কতটা কম জানে।  এটা কেবল পুরুষের জন্যই প্রযোজ্য নয়, অনেক নারীও তাদের প্রধানতম প্রজনন অঙ্গ সম্পর্কে অন্ধকারে থাকেন।  বইয়ের লেখক র‍্যাচেল ই. গ্রস বর্ণনা করেছেন কীভাবে চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুল তথ্য দীর্ঘদিন ধরে প্রজনন অ্যানাটমি (শরীরতত্ত্ব) সম্পর্কে ভুল-বোঝাবুঝিতে ভূমিকা রাখছে।
গ্রসের বই ও পুরো বিষয়টি নিয়ে আমেরিকান সাময়িকী ফোর্বস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।  সেটি ভাষান্তর করেছেন রুবাইদ ইফতেখার।
২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যে গবেষকরা ২০০০ ব্যক্তিকে নিয়ে যৌনতাবিষয়ক একটি কুইজের আয়োজন করেন।  ডেটা সায়েন্টিস্টরা অংশগ্রহণকারীদের একটি শরীরতত্ত্বের চার্ট দেখিয়ে নারীর ক্লিটোরিস (ভগাঙ্কুর), ল্যাবিয়া (যোনির উভয় পাশে ভালভার ভেতরের এবং বাইরের ভাঁজ), ভ্যাজাইনা (যোনি) ইউরেথ্রা (মূত্রনালি) চিহ্নিত করতে বলেন।  এরপর কখন ট্যাম্পন (স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিকল্প হিসেবে অনেক নারী মাসিকের সময় ট্যাম্পন ব্যবহার করেন) বদল করতে হয় এবং যোনি পরিষ্কার রাখার উপায় সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের কিছু প্রশ্ন করা হয়।
কুইজে অংশ নেয়া বেশির ভাগ পুরুষ (ও নারীদের একটি বড় অংশ) সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হন।  গ্রসের কাছে এটা অবাক করা কোনো বিষয় মনে হয়নি।  ডেটা সাংবাদিক ভিক্টোরিয়া ওয়াল্ডারসির মতে, ‘নারী ও পুরুষ উভয়ের তিন ভাগের এক ভাগই জানেন না ভগাঙ্কুর কী’।
৫৯ শতাংশ পুরুষ যোনির অবস্থান সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি।  ৬১ শতাংশ পুরুষ সঠিকভাবে মূত্রনালি চিহ্নিত করতে পারেননি। ৫২ শতাংশ পুরুষ ল্যাবিয়া খুঁজে পাননি।  ওয়াল্ডারসির হতাশার মূল কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক নারীরও তাদের নিজের শরীর সম্বন্ধে ধারণা নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা নারীদের তাদের নিজস্ব দেহ সম্পর্কে বোঝার বিষয়েও জরিপ করেছি।  নারীদের মধ্যে তাদের যৌনাঙ্গ কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে জ্ঞানের একটি উদ্বেগজনক অভাব লক্ষ করা গেছে’।
কুইজে অংশ নেয়া ৪৫ শতাংশ নারী যোনি শনাক্ত করতে পারেননি।  ৫৫ শতাংশ জানেন না যে মূত্রনালির অবস্থান কোথায়।  ৪৩ শতাংশ ল্যাবিয়া শনাক্ত করতে পারেননি।
যোনি সম্বন্ধে এত অজ্ঞতা কেন?
এই প্রশ্নের উত্তরটি বেশ জটিল।  শত শত বছর আগে, শল্যবিদদের শারীরবৃত্তীয় গবেষণার জন্য দেহব্যবচ্ছেদের পরিসর সীমাবদ্ধ ছিল।  উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৪ শতকে ফ্রান্সে চিকিৎসকরা অধিকাংশ সময় ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ড বা জেল থেকে আসা মৃতদেহ ব্যবহার করতেন।
তখন নারীদের মৃত্যুদণ্ড বিরল হওয়ায় ইউরোপে প্রাথমিক শারীরবৃত্তীয় গবেষণা পুরুষ দেহ নিয়েই চলেছে।  ফলে চিকিৎসকদের পক্ষে পুরুষাঙ্গ শারীরিকভাবে দেখা ও চিত্রিত করা সহজ ছিল।  বিপরীতে নারীর পেটের ভেতর ডিম্বাশয়ের মতো অভ্যন্তরীণ প্রজনন কাঠামো তাদের দীর্ঘদিন বিভ্রান্তিতে রেখেছে।  চিকিৎসকরা পুরুষ দেহ অধ্যয়নে সিদ্ধহস্ত হওয়ায় তারা দীর্ঘ সময় নারী দেহকে পুরুষের দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কয়েকজন শল্যবিদের যুক্তি ছিল, গর্ভ ও ডিম্বাশয় একটি উল্টানো লিঙ্গ, যেটা অণ্ডকোষের মতো।  তাদের আশঙ্কা ছিল, নারীরা ঘোড়ায় চড়লে বা যুদ্ধের মতো ‘কঠিন’ অথবা ‘পুরুষালি’ কার্যকলাপ করলে অভ্যন্তরীণ এ অঙ্গগুলো শরীর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে!
এই ভুল-বোঝাবুঝি দীর্ঘ সময় অব্যাহত ছিল।  কোনো নারী তার বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, জ্বর বা অন্য যেকোনো উপসর্গের কথা জানালে চিকিৎসকরা সেটিকে ‘হিস্টিরিয়া’ বলে নির্ণয় করতে থাকেন।  হিস্টিরিয়া এসেছে গ্রিক শব্দ হিস্টিরিয়া থেকে, যার অর্থ জরায়ু।  কিছু চিকিৎসকের যুক্তি ছিল, নারীর জরায়ু শারীরিকভাবে নড়াচড়া করতে পারে বা শরীরের মধ্যে ভেসে বেড়াতে পারে।  এ কারণে তার মানসিক ও শারীরিক অস্বস্তি হয়।
অনেক চিকিৎসক এমনও বিশ্বাস করতেন, একজন নারী খুব বেশি যৌন আকর্ষণ, উত্তেজনা বা দুঃখ অনুভব করলে আবেগগুলো তার শরীরের কোমল অংশকে ধ্বংস করে দিতে পারে।  নারীর শরীরতত্ত্ব নিয়ে এসব ভুল ধারণার কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অগণিত নারী ভুল চিকিৎসা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন।  হিস্টিরিয়াকে একপর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকাল ম্যানুয়াল অফ মেন্টাল ডিজ-অর্ডার থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
২১ শতকে চিকিৎসা ও গবেষণা উন্নত হয়েছে।  এর পরও সীমিত যৌন শিক্ষা ও যৌনতা সম্পর্কে নারীর লজ্জা অনেককে যোনি সম্বন্ধে সঠিক তথ্য শিখতে বাধা দিচ্ছে।  নারী ও জেন্ডার বিষয়ক লেখিকা সাংবাদিক শ্যানেল ডুবফস্কি বলেন, “যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন থেকে আমার মা আমার যৌনাঙ্গকে ‘তোমার সামনের অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করতেন”।
এই অস্পষ্টতা নিজের যোনির স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোলামেলা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ডুবফস্কিকে বাধা দেয়।
তিনি বলেন, ‘এই পরোক্ষতার কাজ হলো যাকে খুব ভোঁতা বলে মনে করা হয় তা এড়িয়ে যাওয়া, ফল যতই বিপজ্জনক হোক না কেন।  যোনি ও ভালভার সঙ্গে জড়িত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া শৈশব-কৈশোর থেকে বেড়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব’।
শারীরবৃত্তীয় জ্ঞানের এই ব্যাপক ঘাটতির পরিণতি বিপজ্জনক হতে পারে।  কেউ শরীরতত্ত্ব ও রজঃসম্বন্ধীয় স্বাস্থ্যের মূল বিষয়গুলো না জানলে যৌনসঙ্গীর সঙ্গে বা একজন চিকিৎসকের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করতে দ্বিধান্বিত হতে পারেন।
শারীরবৃত্তীয় জ্ঞান কীভাবে যৌনতাকে পরিপূর্ণ করতে পারে
শরীর কীভাবে কাজ করে সে সম্বন্ধে ভালো ধারণা থাকলে মানুষ নিজের যৌন চাহিদা ও আনন্দ সম্বন্ধেও শিখতে পারে।  দ্য জার্নাল অফ সেক্স অ্যান্ড ম্যারিটাল থেরাপিতে প্রকাশিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৩৭ শতাংশ নারীর অর্গাজমের জন্য ক্লিটোরাল স্টিমুলেশন (ভগাঙ্কুরের উদ্দীপনা) প্রয়োজন।  যখন একজন নারী বা তার সঙ্গীকে ভগাঙ্কুর খুঁজে পেতে সংগ্রাম করতে হয় তখন তিনি যৌনতার সময় ধারাবাহিক আনন্দ বঞ্চিত হন।
প্রজনন শরীরবিদ্যা সম্পর্কে জানার অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো, আপনি সঙ্গীর সঙ্গে গর্ভনিরোধ ও যৌনতার আনন্দ বিষয়ে কথা বলতে আরও আত্মবিশ্বাসী বোধ করবেন।  সেক্স কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ বাবিনের মতে, ভালো যোগাযোগের ফলে যৌন সম্পর্ক চমকপ্রদ হয়।
বাবিন সংবাদমাধ্যম টুডেকে বলেন, ‘যৌনতার বিষয়ে আলোচনা বা যোগাযোগ নিয়ে নিজের মধ্যে সামান্য উদ্বেগ থাকলেও সেটি বড় প্রভাব ফেলে।  এটি সরাসরি কোনো জুটির যৌন সন্তুষ্টিকে প্রভাবিত করতে পারে।  যেমন- ভগাঙ্কুরের অবস্থান সঠিকভাবে জানা থাকলে সঙ্গীকে আপনি সেটি উদ্দীপ্ত করার আহ্বান জানানোয় আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।  একই সঙ্গে যৌন উদ্দীপনামূলক অন্য অংশগুলো সম্পর্কে নিজের জানাশোনাও ভাগাভাগি করতে পারবেন’।
শারীরবৃত্তীয় তথ্য আপনার স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধিরও সহায়ক
নিজের যৌনাঙ্গের বিন্যাস সম্বন্ধে যদি পরিষ্কার ধারণা থাকে তখন নিজের স্বাস্থ্যের সঠিক যত্ন নেয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যে হওয়া এক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে ভিক্টোরিয়া ওয়াল্ডারসি তার সম্ভাব্য স্বাস্থ্য জটিলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।  এ জটিলতাগুলো তখনই দেখা দিতে পারে, যখন নারীরা নিজেদের যৌনাঙ্গ সম্পর্কে জানেন না।
ওয়াল্ডারসি বলেন, ‘যোনিতে প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া থাকে, তবে ভালো ধরনের।  পুরো এলাকাটা এরা সুস্থ রাখে।  যোনির ভেতর শুধু পানি দিয়ে ধুলেও ব্যাকটেরিয়ার প্রাকৃতিক ভারসাম্য হতে পারে এবং সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।  জরিপ করা নারীদের অর্ধেক (৪৬ শতাংশ) জানেন না যে, যোনির ভেতরের অংশ ধোয়া উচিত নয়।  এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) মনে করেন এটি প্রতিদিন ধোয়া উচিত’।
যৌনাঙ্গে বা তার আশপাশে জ্বালাপোড়া বা চুলকানির মতো উপসর্গগুলো চিকিৎসকের পক্ষে ব্যাখ্যা করাটা সহজ নয়।  ৭৫ শতাংশ নারী তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ইস্ট ইনফেকশনের শিকার হয়েছেন।  এ ধরনের ইনফেকশন সাধারণ বিষয়, তবে চিকিৎসা ছাড়া খুব কম সময়েই এ রোগ ভালো হয়।  দুর্ভাগ্যবশত, যেসব নারী তাদের যৌনাঙ্গ সম্পর্কে জানেন না তারা উপসর্গগুলো খারাপ পর্যায়ে না যাওয়া পর্যন্ত ইস্ট ইনফেকশন চিহ্নিত করতে পারেন না।
যৌনাঙ্গ সম্পর্কে পরিষ্কার জানা থাকলে নিজের যত্ন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব।  ফলে সক্রিয়ভাবে ইস্ট বা ত্বকের ইনফেকশন, এসটিআই ও টিএসএস (বিষাক্ত শক সিন্ড্রোম) এড়ানো যায়।
ফ্যামিলি রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় অল্পবয়সী নারীদের যোনি সম্বন্ধে জ্ঞানের স্বাস্থ্য সুবিধাগুলো বলা হয়েছে।  যোনিপথের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে ক্লাস নেয়ার পর কিশোরীরা তাদের মাসিকের প্যাড ও প্যান্টি ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন করেছে, অতিরিক্ত পানির ব্যবহার এড়িয়েছে এবং যৌনাঙ্গ স্পর্শ করার আগে হাত ধুয়েছে।
জনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সঠিক তথ্য কোথায় পাওয়া যায়
যোনির স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও জানতে বা নির্ভরযোগ্য তথ্য খোঁজার জন্য আপনাকে সেক্স এড ক্লাসে নাম লেখাতে হবে না।
র‍্যাচেল ই. গ্রসের ভ্যাজাইনা অবসকিউরা বইটি যোনি সম্পর্কে মানুষের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভ্রান্ত ধারণা সামনে তুলে ধরে।  মা-বাবা ও শিক্ষকরা ‘দ্য ফ্যাক্টস অফ লাইফ’ কেনার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।  এটি জোনাথন মিলার ও ডেভিড পেলহাম রচিত একটি ত্রিমাত্রিক, পপ-আপ বই যা যৌনাঙ্গ ও যৌনাঙ্গের সঠিক চিত্র দেখায়।
আপনি ল্যাবিয়া, ভালভা, যোনি ও ভগাঙ্কুর দেখার জন্য একটি আয়না ব্যবহার করতে পারেন।  স্থানীয় স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও পরিকল্পিত মাতৃত্ব আপনাকে যোনি ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সহায়ক তথ্য দিতে পারে।

ডিসি/এসআইকে/এমএসএ