আইসিইউ সংকটে চট্টগ্রামে মৃত্যুর মিছিল

134

দৈনিক চট্টগ্রাম ডেস্ক >>>
চলমান বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)।  তবে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইসিইউ বেড নেই।  যে কারণে প্রতিদিনই করোনা রোগীদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।  করোনা ভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা খুবই সীমিত সংখ্যক থাকলেও পর্যায়ক্রমে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকে এবং মৃত্যু সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।  বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগ ঢাকা বিভাগের সাথে মৃত্যু পরিসংখ্যানে সমানে সমান এগিয়ে চলছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে করোনার হটস্পট চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে করোনা ডেডিকেটেড হিসেবে ঘোষিত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা মাত্র আটটি।  এসব ডেডিকেটেড হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা মাত্র ৬৯৭টি।  তার মধ্যে সরকারি চারটি হাসপাতালে ৪৮২টি এবং বেসরকারি চারটি হাসপাতালে ২১৫টি।  সরকারি চারটি হাসপাতালের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০টি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস বা বিআইটিআইডিতে ৩২টি, ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ১৫০ এবং চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালে ১০০টি শয্যা রয়েছে।  বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ১০০টি, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ২৮টি, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালে (ইউএসটিসি) ৪৭টি এবং ফিল্ড হাসপাতালে ৪০টি।  তবে আক্রান্তের তুলনায় করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক শয্যা না থাকায় হাসপাতালে রোগীর ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের জন্য চট্টগ্রামে আইসিইউ বেড রয়েছে মাত্র ৩৫টি।  তার মধ্যে সরকারি হাসপাতালে মাত্র ১৬টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র ১৯টি।  সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬টি, ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ বেড রয়েছে।  বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ১০টি, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ৬টি এবং বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালে তিনটি আইসিইউ বেড রয়েছে যা আক্রান্ত্র রোগীর তুলনায় অনেক কম।
এত অল্পসংখ্যক আইসিইউ বেড থাকার কারণে রোগীদের হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে।  আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না তারা।  ফলে চট্টগ্রাম বিভাগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭০ জন।  মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার।  গতকাল শুক্রবার (২৬ জুন) পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আট বিভাগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৪ জন।  একই সময়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬১ জন।
মোট মৃতের হিসাবে বিভাগীয় পরিসংখ্যান অনুসারে দেখা গেছে, গতকাল শুক্রবার (২৬ জুন) সকাল আটটা পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের সর্বোচ্চসংখ্যক ৪৬৮ জনের মৃত্যু হয়।  চট্টগ্রাম বিভাগে মাত্র চারজন কম ৪৬৪ জনের মৃত্যু হয়।  মৃত্যুর পরিসংখ্যানে তৃতীয় স্থানে রাজধানী ঢাকা, এখানে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৯৪ জন।  আর চট্টগ্রাম জেলায় এই সংখ্যা ১৬৫ জন।  অন্যান্য বিভাগের মধ্যে ময়মনসিংহে ৪৬ জন, রাজশাহীতে ৬৯, রংপুরে ৪৪, খুলনায় ৫০, বরিশালে ৫৩ এবং সিলেটে ৫৯ জন মারা যান।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগ সংক্রমণের দিক দিয়ে অন্যতম হটস্পট হলেও আক্রান্ত রোগীদের জন্য হাসপাতালগুলোতে সুচিকিৎসা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।  বিশেষ করে আইসিইউ বেড সংকটে করোনা রোগীদের মৃত্যু বেশি হচ্ছে চট্টগ্রামে।  গত ২১ জানুয়ারি থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৪৪৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।  গত ২৪ ঘণ্টায় (২৫ জুন সকাল আটটা থেকে ২৬ জুন সকাল আটটা পর্যন্ত) ১৮ হাজার ৪৯৮টি নমুনা পরীক্ষা করে ৩ হাজার ৮৬৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়।  এ নিয়ে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৪ জন।
সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণকারী ৪০ জনের ঢাকা বিভাগে ১৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২ জন, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ৪ জন করে এবং সিলেট ও রংপুর বিভাগে ৩ জন করে রয়েছেন।
এছাড়াও ২৬ জুন (শুক্রবার) চট্টগ্রামে নতুন করে আরো ১৬৯ জনের দেহে কোভিড- ১৯ সংক্রমণ ধরা পড়েছে।  শুধুমাত্র চট্টগ্রাম জেলায় এ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা মোট ৭ হাজার ৬২৫ জন।  আর একই সময়ে আরো ৫ জনের মৃত্যুর মাধ্যমে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ জনে।
চট্টগ্রাম বিএমএ’র সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মইজ্জুল আকবর চৌধুরী বলেন, ‘সমগ্র চট্টগ্রামের জন্য ২০টি আইসিইউ বেড এটা নামমাত্র ছাড়া কিছুই না।  সাধারণ মানুষের চাহিদার কাছে এটা কখনও পর্যাপ্ত নয়’।
চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটি সদস্য সচিব ডা. সুশাস্ত বড়ুয়া বলেন, ‘অক্সিজেন যদি আমরা দিতে পারতাম।  তার সাথে আইসিইউ আর ভেন্টিলেটর সাপোর্ট যদি আমরা দিতে পারতাম তাহলে চট্টগ্রামে চিকিৎসার জন্য যে হাহাকার চলছে সেটি কিছুটা হলেও মোকাবেলা করতে পারতাম’।
সবচে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা।  চাহিদার একাংশকেও সুবিধা দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।  চলতি সপ্তাহের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শয্যার আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আবদুর রব।  তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে বলে আমি বলবো। কারণ এখন ঘরে ঘরে জ্বর আসছে। ঘরে ঘরে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে’।
করোনা রোগীদের সুবিধার্থে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হলি ক্রিসেন্ট ক্লিনিক, ইউএসটিসি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিতের কথা বলা হলেও গত দু’মাসেও এসবের কোনো সুরাহা হয়নি।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘আইসিইউ নিয়ে আমরা যে সুবিধার কথা বলেছিলাম, আসলে নার্সদের প্রশিক্ষণের ব্যাপার আছে।  চিকিৎসক যারা আছেন তারাও পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেছেন।  সব আইসিইউগুলো কার্যকরী হতে আরো দুয়েকদিন সময় লাগবে’।
শুধু করোনা আক্রান্ত রোগীরা অক্সিজেন কিংবা আইসিইউ সংকটে ভুগছেন, তা নয়।  স্বাভাবিক শ্বাসকষ্টের রোগীরাও প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে এই সুবিধা পাচ্ছে না।  দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার সাথে সাথে এখানকার ছোট-বড় ৫০টি প্রাইভেট ক্লিনিক চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়।  অথচ অন্তত ২০টি ক্লিনিকে আইসিইউ সুবিধা রয়েছে।

ডিসি/এসআইকে/এসএজে